২০০ দালালের হাতে জিম্মি মুন্সীগঞ্জ পাসপোর্ট অফিস!

আব্দুস সালাম: পাসপোর্ট আবেদনকারী পাসপোর্ট না পেলেও দালাল পেয়ে যান পাসপোর্ট। এমন অভিযোগ নিয়ে পাসপোর্ট অফিসে বিষয়টি জিজ্ঞাসা করতে গেলে অফিসার নিজেই সাংবাদিকদের সাথে তর্কে জড়িয়ে যান। ভেতরে-বাইরে ২০০ দালালের নিয়ন্ত্রণে মুন্সীগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস। সাংবাদিকদের নাজেহাল করার ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে।

ইসমাইল হোসেন এই অফিসের একজন নৈশপ্রহরী। তিনি আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা দামের মোটর বাইক হাঁকিয়ে বেড়ান। তিনি জসিম প্লাজার কম্পিউটারের দু’টি দোকান ও রকিব মার্কেটের দু’টি কম্পিউটারের দোকানসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে পাসপোর্ট আবেদনের ফরম কালেকশন করে রাতভর কাজ করেন। গভীর রাত পর্যন্ত পাসপোর্টের ডেলিভারি এবং ফাইল দেয়া-নেয়া চলে। তিনি ইতোমধ্যে কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

মুন্সীগঞ্জের পাসপোর্ট অফিস দালালদের নিয়ন্ত্রণ থেকে বের হতে পারছে না। কারণ অফিসের ভেতরেই রয়েছে অসংখ্য দালাল। একের পর এক সংবাদপত্রে নিউজ প্রকাশিত হলেও মুন্সীগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের দালালি বা দালালের মাধ্যম বন্ধ হয়নি। বাধ্য হয়েই দালালের স্মরণাপন্ন হন গ্রাহকরা। একশ্রেণীর অফিস স্টাফ আর দালালদের সখ্যের মাধ্যমে জেলার গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসটি দালালদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছে। জরুরি পাসপোর্ট কোনো ক্রমেই দালাল ছাড়া সঠিক সময়ে গ্রাহকের হাতে আসে না। আবার দালাল ধরলে সব যেন পানির মতো সহজ। এমনও প্রমাণ পাওয়া যায় এই অফিসের আনসার স্টাফ, মেয়াদ শেষে অন্যত্র চাকরি না করেও মুন্সীগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসের দালালি কাজে যোগ দিয়ে মাসে লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাসপোর্ট অফিসের একজন স্টাফ জানান, সাবেক স্টাফ আমিনুল, নাজমুল, আলমগীর এই অফিসের আশপাশে ভাড়া থেকেই দালালি করে যাচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে। অথচ জেলার কোনো সচেতন ব্যক্তি এ বিষয়ে কথা বলছেন না। এই পাসপোর্ট অফিসটি ২০০ দালালের হাতে জিম্মি। এমন খবর একাধিক পত্রিকায় নিউজ হওয়ার পরও অফিস স্টাফদের কারণে এই চেহারা আরো ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে।

পাসপোর্ট করতে আসা সিরাজদিখানের শেখর নগরের পাউসার গ্রামের মোহাম্মদ সেলিম। সাত মাস হয়েছে পাসপোর্ট প্রিন্ট হয়েছে। কিন্তু পাসপোর্ট হাতে না পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। ফাস্ট কম্পিউটারের জাহাঙ্গীর এই পাসপোর্টটি তার কাছেই আছে বলে আরো ২৫ হাজার টাকা দাবি করে ফোন দেন। ইতোমধ্যে জানা যায় এই পাসপোর্ট গ্রাহক বই না পেলেও দালালের টাকার দাবি এবং টাকা না দিলে চর থাপ্পরের হুমকি পাচ্ছেন হরহামেশা। যার পাসপোর্ট ডেলিভারি স্লিপ নং ৪১১৫০০০০৫৭৪২৬, জমা বা ফিঙ্গার তাং ২১/০৪/২০২২, ডেলিভারি তাং ০২/০৫/২০২২। সেলিমের কাছ থেকে জানা যায়, তার আগের পাসপোর্ট হারিয়ে যায়। নামে ও বয়সে ভুল ছিল। এভিডেভিড করা হয়, এমনকি ডিএসবি ভেরিফিকেশন করেন। তিনি আরো বলেন, দালাল জাহাঙ্গীরকে প্রথমে ৩০ হাজার টাকা দেন। পরে ভেরিফিকিশনের জন্য আরো পাঁচ হাজার টাকা নেন জাহাঙ্গীর। এখন আরো ২৫ হাজার টাকা দাবি করছেন জাহাঙ্গীর দালাল।

এ বিষয়ে কয়েকজন সাংবাদিক পাসপোট অফিসে গেলে পাসপোর্ট অফিসার (এডি) সাংবাদিকদের স্বাক্ষর করে যাওয়ার কথা বলেন এবং কী জন্য এসেছি জানতে চান। যখন বলা হয় (স্লিপ দেখিয়ে) এই কাজে এসেছি তখনই ক্ষেপে যান এডি। একপর্যায় আমরা আমাদের নিয়মে তর্ক না করে ফিরে আসি। তবে অফিস পিয়ন স্লিপ দেখে বলেন, এই পাসপোর্ট এখানেই আছে, আর এই স্লিপ আসল না। আবার বলেন, অন্য কাউকে দিয়ে পাসপোর্ট নিয়েছেন আপনারা। এমন কথার উত্তর আমরাও দিতে পারিনি। তবে কম্পিউটারে স্লিপের নম্বর অনুযায়ী চেক করলে জানতে পারি এই পাসপোর্টটি এই পাসপোর্টটি আছে। দালালরা যে ভিকটিমকে টাকার জন্য হুমকি দিচ্ছে এটা নিশ্চিত বোঝা যায়।

মুন্সীগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক উম্মে শাকিলা তানিয়া জানান, কোনো সাংবাদিকদের সাথে খারাপ ব্যবহার করা হয়নি। নৈশপ্রহরী ইসমাইল বিভিন্ন কম্পিউটারের দোকান থেকে ফাইল কালেকশন করে ১৫০০ টাকা করে নেন বিষয়টি উল্লেখ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানান। তবে বিষয়টি তিনি দেখবেন বলে জানিয়েছেন।

এ বিষয় জেলা প্রশাসক কাজী নাহিদ রসুলের সাথে তার সেল ফোনে কথা হলে তিন বলেন, বিষয়টি দেখা হবে এবং এর প্রতিকারে অভিযান চালিয়ে পাসপোর্ট অফিস দালালমুক্ত করা হবে।

নয়া দিগন্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.